চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত ভবন দখলের চেষ্টা এবং ভাঙার প্রতিবাদ জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।
মঙ্গলবার (৫ জানুয়ারি) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এ প্রতিবাদ জানান। বিবৃতিতে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের খুঁটির জোর কোথায় তা খুঁজে বের করে শাস্তির দাবি জানান তিনি।
এছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্তের সঙ্গে অশোভন আচরণকারীদের আইনের আওতায় আনারও দাবি জানান সাবেক এ সিটি মেয়র।
বিবৃতিতে আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সূতিকাগার ছিল চট্টগ্রাম। এই চট্টগ্রাম থেকেই মাস্টার দা সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়েদ্দেদার, বিপ্লবী বিনোদ বিহারীসহ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্রসৈনিকরা নেতৃত্ব দিয়েছেন। চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জে অবস্থিত যাত্রা মোহন সেনগুপ্ত ও দেশপ্রিয় যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্তের বাড়িতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, মৌলানা শওকত আলীসহ বিপ্লবীদের যাতায়াত ছিল। দুঃখের বিষয় সেই ঐতিহাসিক এবং স্মৃতিবিজড়িত দেড়শ বছরের পুরনো স্থাপনা ভাঙার অপচেষ্টা করছে একটি চক্র। তারা সেটি দখলের জন্য বুলডোজার দিয়ে ভবনের কিছু অংশ ভেঙে দিয়েছে। যা খুবই দুঃজনক এবং নিন্দনীয়। এ ধরণের ঘটনা যারা করেছে তারা দেশের শত্রু, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের শত্রু। চট্টগ্রামের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা ও ঐতিহাসিক এ ভবন রক্ষার জন্য সকল শ্রেণিপেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সাবেক মেয়র নাছির বলেন, জমিটি অর্পিতসম্পত্তি হিসেবে সরকার লিজ দিয়েছে। লিজকৃত জমি বিক্রি করা যায়না। তাহলে যারা জমির মালিকানা দাবি করে ঐতিহাসিক ভবনটি ভেঙেছে বা দখল করার চেষ্টা করছে তাদের ভিত্তি কোথায়? এখানে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে একটি চক্র কাজ করছে। তারা হয়তো জাল কাগজপত্র তৈরি করে এ ধরণের অপচেষ্টা করছে। কিন্তু চট্টগ্রামের মানুষ তা মেনে নিবে না। একটি দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষা করা সকলের কর্তব্য। এছাড়া যারা এ ধরণের নিন্দনীয় ঘটনার পেছনে ইন্ধন দিচ্ছে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। ঐতিহাসিক এই বাড়ি সংরক্ষণ করে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন স্মৃতি ও গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে আহ্বান জানান তিনি।
অবিলম্বে ঐতিহাসিক এ ভবন রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে চট্টগ্রামবাসীকে সাথে নিয়ে দখলদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার কথা জানান আ জ ম নাছির।
সোমবার সকাল ১০টার দিকে এম ফরিদ চৌধুরীর ছেলে ফরহাদ ও ফয়সালসহ শতাধিক লোক বাড়িটি দখল নিতে আসেন। ফরহাদ ও ফয়সালের সঙ্গে যুবলীগ নেতা পরিচয় দেয়া গিয়াস উদ্দিন সুজন ও মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে অর্ধশতাধিক তরুণ-যুবক স্কুলটির ভেতরে প্রবেশ করেন। তারা পুলিশের উপস্থিতিতে স্কুলের শিক্ষক এবং সন্তানদের ভর্তি করাতে যাওয়া অভিভাবকদের ধাক্কা দিয়ে সেখান থেকে বের করে দেন।
পরে দুপুর ২টার দিকে সেখানে যান অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত। তিনি জানতে চান- ভবন কারা ভেঙেছেন, কেন ভাঙা হলো? জবাবে যুবলীগ নেতা গিয়াস উদ্দিন সুজন জানান, আদালতের আদেশে জেলা প্রশাসনের লোকজন তাদের ভবনের দখল বুঝিয়ে দিয়েছে, সেজন্য তারা ভাঙছেন। এসময় তরুণ-যুবকরা রানা দাশগুপ্তের সঙ্গে অশোভন আচরণও করেন। তারা বলতে থাকেন- রানা দাশগুপ্তকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দাও, তার ওপর বুলডোজার চালিয়ে দাও। এসময় রানা দাশগুপ্ত বুলডোজারের সামনে বসে পড়েন। তার প্রতিরোধের মুখে জেলা প্রশাসন ঐতিহ্যবাহী বাড়িটি সিলগালা করে দেয় । ভবনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে বলেও জানায় প্রশাসন।
আঠারো শতকের খ্যাতিমান বাঙালি আইনজীবী যাত্রা মোহন সেনের গড়ে তোলা বাড়িটি স্বাধীনতার পর থেকে বেদখল হয়ে আছে। অর্পিতসম্পত্তি হিসেবে ঘোষিত বাড়িসহ জমিটি জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে শামসুদ্দিন মো. ইছহাক নামে এক ব্যক্তি ‘বাংলা কলেজ’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। সর্বশেষ সেখানে ‘শিশুবাগ’ নামে একটি স্কুলের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল।
